ট্রমা শুধু মনে নয়, শরীরেও বাস করে: The Biology of Trauma
অনেকেই মনে করেন ট্রমা মানে কেবল একটি মানসিক অভিজ্ঞতা—কোনো দুঃখজনক ঘটনা, শৈশবের কষ্ট, সম্পর্কের ভাঙন কিংবা জীবনের কোনো কঠিন অধ্যায়। কিন্তু যদি ট্রমা আসলে আমাদের শরীরের ভেতরেও বাস করে? যদি বছরের পর বছর ধরে বহন করা ক্লান্তি, উদ্বেগ, ব্যথা কিংবা কিছু অদ্ভুত শারীরিক সমস্যার পেছনে লুকিয়ে থাকে অমীমাংসিত ট্রমা?
ড. অ্যাইমি অ্যাপিজিয়ানের The Biology of Trauma ঠিক এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছে।
ড. অ্যাপিজিয়ান একসময় ছিলেন একজন সফল সার্জন। বায়োকেমিস্ট্রি ও জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, প্রতিরোধমূলক ও আসক্তি চিকিৎসায় ডাবল বোর্ড-সার্টিফায়েড চিকিৎসক। কিন্তু একসময় নিজের জীবনের ট্রমা ও তার শারীরিক প্রভাব তাঁর সার্জারি ক্যারিয়ারকে থামিয়ে দেয়। তখনই তিনি গবেষণার পথে হাঁটেন—ট্রমা আসলে মানুষের শরীরে কী করে, তা জানার জন্য।
দশ বছরেরও বেশি সময়ের গবেষণার ফল এই বই।
ট্রমা: একটি জৈবিক বাস্তবতা
বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো—ট্রমা শুধু মানসিক নয়, এটি একটি জৈবিক ঘটনাও।
ট্রমা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে পুনর্গঠন করতে পারে। এটি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, কোষের শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনে, এমনকি দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, উদ্বেগ, অবসাদ, অটোইমিউন রোগসহ নানা শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
ড. অ্যাপিজিয়ান যখন বলেন “শরীর ট্রমা ধারণ করে”, তিনি কোনো রূপক ব্যবহার করছেন না। তিনি বলছেন একেবারে আক্ষরিক অর্থে—কোষীয় স্তরে।
ট্রমার নতুন সংজ্ঞা
বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ট্রমার সংজ্ঞা।
“Too much, too soon. Or too little, for too long.”
অর্থাৎ, খুব বেশি চাপ খুব দ্রুত এসে পড়া, অথবা দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় সমর্থন, ভালোবাসা বা নিরাপত্তার অভাব—দুটোই ট্রমার জন্ম দিতে পারে।
এই সংজ্ঞা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। কারণ এতে বোঝা যায়, ট্রমা সৃষ্টি করতে সবসময় বড় কোনো দুর্ঘটনা বা ভয়াবহ ঘটনা দরকার হয় না। অনেক সময় ছোট ছোট অভাব, অবহেলা বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও গভীর ছাপ রেখে যেতে পারে।
নিরাময়ের একটি বৈজ্ঞানিক রোডম্যাপ
এই বইকে আলাদা করে তুলেছে শুধু এর বিজ্ঞান নয়, বরং নিরাময়ের জন্য প্রস্তাবিত ধাপভিত্তিক পদ্ধতি।
ড. অ্যাপিজিয়ান দেখিয়েছেন, ট্রমা থেকে সুস্থ হওয়া কোনো এলোমেলো প্রক্রিয়া নয়। শরীরের একটি নিজস্ব জৈবিক যুক্তি আছে, এবং সেই যুক্তিকে সম্মান করেই নিরাময়ের পথে হাঁটতে হয়।
বইটি পাঠককে শেখায় কীভাবে নিজের শরীরকে আবার নিরাপদ অনুভব করতে সাহায্য করা যায়, কীভাবে স্নায়ুতন্ত্রকে স্থিতিশীল করা যায় এবং কীভাবে শরীরকে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা যায়।
কেন পড়বেন?
যারা ট্রমা, মানসিক স্বাস্থ্য, স্নায়ুতন্ত্র, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা শরীর-মন সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহী, তাদের জন্য The Biology of Trauma অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই।
বিখ্যাত Polyvagal Theory-এর প্রবর্তক Stephen Porges বইটিকে “নিরাময়ের জন্য সহানুভূতিশীল ও বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিসমৃদ্ধ একটি পথনির্দেশিকা” বলে উল্লেখ করেছেন। বইটির ভূমিকাও লিখেছেন Gabor Maté, যিনি ট্রমা বিষয়ক অন্যতম প্রভাবশালী লেখক।
সবশেষে, এই বই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়—
আপনার শরীর ভাঙা নয়।
বরং সে দীর্ঘদিন ধরে আপনাকে রক্ষা করার চেষ্টা করে এসেছে, তার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে।
The Biology of Trauma শেখায়, কীভাবে সেই শরীরকে নিরাপদভাবে অতীতের বোঝা নামিয়ে রাখতে সাহায্য করা যায়।
বই:The Biology of Trauma
লেখক: Aimie Apigian
ধরণ: ট্রমা, স্নায়ুবিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও আত্মউন্নয়ন।




