ভিন্নমত, দ্বন্দ্ব, কলহ, হট্টগোল হতে ঝগড়া পর্যন্ত মুখেমুখে চালিয়ে নেওয়া গেলেও হাতাহাতির পর্ব শুরু হলে তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তান্ডবে পরিণত হয়। ধাক্কাধাক্কি পর্যন্তও বেশি ঝুঁকি মনে হয় না আমার কাছে। পাশে দাঁড়িয়ে দেখা যায়। তবে এ পর্যন্ত শুধু দেখে মজা পাওয়া যায় না। খেয়াল করে শুনতেও হয়। এখানে দেখা অপেক্ষা শোনার গুরুত্ব বেশি। বিশেষ করে অন্যের পারিবারিক বিষয়ে ঝগড়া শুনতে অনেককেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
তখন আমার কিশোর বয়স। আমার দাদা বাড়ি হতে নানা বাড়ির দূরত্ব এক মাইল পথ। ভ্যানে গেলে দুই টাকা, হেটে গেলে আধ ঘন্টা সময় লাগে। হাতে টাকার অভাবের সাথে সময়ের অভাবের সংশ্লিষ্টতা অঙ্গাঙ্গী। টাকা এবং সময় উভয়ের অভাব মানুষকে কোনঠাসা করে ফেললেও পর্যাপ্ত সময় থাকলে টাকার অভাব অনেকটা সামলে নেয়া যায়। সুতরাং কিছু সময় ব্যয় করে দুটি টাকা সাশ্রয় সহজ ও বুদ্ধিমানের কাজ ছিল আমার জন্য। তখন গ্রামে এতো ঘনবসতি ছিল না। দুই গ্রামের মধ্যে মস্ত ধানক্ষেত। অধিকাংশ গ্রামের গড়ন গম্বুজ আকৃতির হয়ে থাকে। ঘনবসতি ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে গম্বুজের মাথার মত গ্রামের শেষভাগে বিলের ধারে একটি বাড়ি দিয়ে বসতির শেষ হয়। দুই গ্রামের দুই প্রান্ত বিলে/মাঠে এসে শেষ হয়। সুতরাং গ্রামের এই শেষই গ্রামের শুরুও বটে।
দিনের বেলা হেটে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল। ক্ষেত-খামার, ধান-গম, গরু-ছাগল, গাছ-ফুল, কলা-কুল অনেক কিছু দেখতে দেখতে দাদা বাড়ি হতে নানা বাড়িতে চলে যেতাম। রাতে সহচরী হত চাঁদ। নানা বাড়ির মস্ত উঠোন হতে চাঁদটা নিয়ে দাদা বাড়ির উঠোনে এনে ঝুলিয়ে দিতাম। ভাবটা এমন ছিল যে, চাঁদটা আমার বাপ-দাদার সম্পত্তি। তেমনি একদিন শীতের সকালে দাদা বাড়ি হতে নানা বাড়িতে যাচ্ছিলাম। গ্রাম শেষে মাঠ, মাঠ শেষে নানা বাড়ির গ্রাম। গ্রামে প্রবেশের আগেই মানুষের উচ্চকণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম। হাওয়ায় ভেসে আসছিল কথা। আমার হাঁটার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিলাম। কোন বাড়ির শব্দ এগিয়ে দেখতে হবে। প্রথম বাড়ি পরেই গলিপথের শুরু। গলিপথ দিয়ে তিন-চারটা বাড়ি পরেই স্বামী-স্ত্রীর বাকবিতণ্ডা শুনতে পেলাম। দুইজন একে অপরের প্রশ্নের উত্তর করছে। পাশাপাশিই তারা আছে তবে যেন দুইজন দুই গ্রামের শেষবাড়ি দুটিতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে একে অপরের কুশল বিনিময় করছে। আমি খুব ধীর গতিতে হাঁটছিলাম। যখন দেখলাম বেশকিছু দর্শক-শ্রোতা সাপ খেলা দেখার মত নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে তখন নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলাম না। দাঁড়িয়ে গেলাম বাড়ির সামনেই। বাড়িটি কলাগাছের শুকনো পাতা দিয়ে ঘেরা। ঘেরাটাও বেশ পুরাতন। দুই-এক জায়গায় পাতা নেই। তাই উঁকি না দিলেও বাড়ির ভেতরটা দেখা যাচ্ছে।
খেয়াল করলাম বেশকিছু মহিলা মাথায় ঘোমটা দিয়ে মুখে আচল গুজে লজ্জানত মুখে ঝগড়া উপভোগ করছে। গলিতে যেসব পুরুষেরা গরুর খুটো, বাঁশের ঝুড়ি, কোদালের হাতল বানাচ্ছিল তারা খুব ধীরে কাজ করছিল। কারণ কাজে তাদের মনোযোগ ছিল না। আমাদের সকলের মনোযোগ ঐ বাড়িতে। একটি দুই-তিন বছরের ছেলে বাচ্চা মা-বাবার উচ্চকণ্ঠের আলাপে ভীত হয়ে উঠোনের মাটিতে বসে কাঁদছে। বাচ্চাটির গায়ে শীতের পোশাক বলতে একটি গেঞ্জি এবং মাথায় উলের টুপি পরানো আছে। বাচ্চাটি চিৎকার করে সমানে কাঁদছে আর নাক দিয়ে সর্দি গড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে স্বামী-স্ত্রীর কোনো খেয়াল নেই। স্বামীর খেয়াল তার তেজী স্ত্রীর দেকে। তার দাবী সবকিছুর কৈফিয়ত কেন স্ত্রীর কাছে দিতে হবে? স্ত্রীর দাবী- তাকে যদি স্বামীর কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়, স্বামী কেন দিবে না? স্বামী বললো-
দেব না কৈফিয়ত। কী করবি?”
-তা দিবা কেন? তুমি একটা খারাপ লোক। বদ বিটা।
-কি বললি?
-তুইসহ তোর পরিবারের সাবার স্বভাবই খারাপ।
-কি বললি, আর একবার বল।
-স্ত্রী তার সংলাপটি একনাগাড়ে তিনবার বললো
-খারাপ, খারাপ, খারাপ।
বাকবিতণ্ডা, ঝগড়া, কলহ, গ্যঞ্জাম পার হয়ে হাতাহাতিতে পৌছে তাণ্ডব শুরু হলো। স্বামী দুটি চড় দিতেই স্ত্রী কিছু একটা হাতে নিয়েছিল। সম্ভবত কলাপাতার ডাটি। ছাগলে কলার পাতা খেলেও ঐ শক্ত অংশ খায়নি। হয়ত ছাগল বুঝেছিল। এই সংসারে কিছুই ফেলনা নয়। বাঁচিয়ে রাখলে সংসারের কাজে লেগে যাবে। স্ত্রী শুধু ডাটিটি উঁচু করেছিল। স্বামী দ্রুত ধরে ফেলে সেটারই ব্যবহার করল। প্রথম দুই-তিন বাড়ি পর্যন্ত সবাই দেখলেও যখন দেখল স্ত্রীকে মারতে মারতে ভূপাতিত করে ফেলেছে তখন দুই-চারজন মহিলা স্ত্রীটিকে বাঁচাতে এগিয়ে গেল। একটি কিশোরী ছেলে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে অদূরেই দাঁড়িয়ে রইলো। কোদালের হাতলসহ চাচা এসে বললো-
-“আর যদি একটি বাড়ি বৌমার গায়ে লাগে তোকে এই হাতল দিয়ে মেরে শেষ করে দেব, হারামজাদা। বৌ মারা কোন ভদ্র লোকের কাজ? বদমাইশ।”
আমি ভীত হয়ে গেলাম। এইবার বুঝি এই দুই পুরুষে যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু না। কিশোরীর হাত হতে স্বামী তার ছেলেটিকে ছিনিয়ে নিয়ে আমার পাশ দিয়ে হেটে বেরিয়ে গেল মাঠের দিকে। যেন কালো একটি এড়ে গরু শিঙ দিয়ে রাগের চোটে মাটি খুচিয়ে অবশেষে দড়ি ছিড়ে গোয়াল হতে বেরিয়ে গেল। তাণ্ডব শেষ। আমি ধীরগতিতে আবার হাটা শুরু করলাম। দুইজন নারী আমার পিছেই হাটছিল এবং নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিল-
-কেনরে, স্বামীর সব কথায় জাবাব দিতে হবে? পাইছিস জবাব? পুরুষ মানুষ কি ইয়ারকি? কি কও বু?
-জানিনে, ও বিটারও দোষ আছে। নিত্যদিন যে বৌ তোর জ্বালায় সে জ্বালা সইবি কেন? বৌ বাদ দিলেই হয়। নিত্যদিন এইরকম নাটক আর দেখে পারা যাচ্ছে না।
-তা যা কইছো। কাজ বাদ দিয়ে নিত্যদিন এদের এই কাইজে দেখতিই আমার সময় চলে যায়। এতোক্ষণে গোবর গাথার কাজটা শেষ হয়ে যেত। দেখ আমার আবার বাড়ি যেয়ে ময়নার বাপের হাতে ঘাপান খাওয়া লাগে কি না।
-নে পা চালিয়ে হাট।
তখন আমার কিশোর মনে আমি ভাবছিলাম যে, আমি না হয় পথিক; পথে থমকে থমথমে মূহুর্তে নিজেকে সামলাতে না পেরে সময় নষ্ট করলাম। এতো আমার সাশ্রয় হওয়া দুই টাকার মধ্যে আশ্রয় পাওয়া ঘটনা। এরা যারা বাড়ির কাজ ফেলে ঝগড়া দেখতে এসেছিল এদের পুলকটা কিসে? এখন বুঝি- অন্যের মাইর খাওয়া দেখাও একটি পুলক। আমরা পুলকে অন্যের অন্যায় দেখি; ঝগড়ায় নীরব সঙ্গ দিই।
মোঃ মিজানুর রহমান
কথাসাহিত্যিক ও কবি





